বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৫

আমায় চিনেছ আকাশলীনা ?


আবার বোম্বে এলাম; নাগপুরের কমলালেবুর মত শীতের আবেশ গায়ে মেখে পশ্চিমঘাট - নাসিকের দ্রাক্ষাক্ষেত পেঁয়াজের আবাদ আর শুষ্ক দন্ডকারন্য পেরিয়ে । পৌষ মাস এসে গেছে অথচ ঠান্ডা নেই একটুও।  স্কুলে পড়ার দিনগুলো ; আমাদের অ্যানুয়াল এক্সামিনেশন শেষ হত মার্চ গড়িয়ে এপ্রিল এলে ; রাস্তার দুধারে কৃষ্ণচূড়া লাল হয়ে থাকত ; সাইকেল করে একছুটে বাড়ি ফিরেই তিস্তার ধারে চলে যেতাম। ধু-ধু  চৈত্রের মাঠে  কুলের মরশুম ফুড়িয়ে গেলে ন্যাড়া বিবর্ণ কুলগাছের তলায় চর-চরে রোদ্দুরে ঘূর্ণি উঠতো। কারা যেন শামিলারবসতের ওপারে দূরে দিকচক্রবাল জুড়ে সুপুরির বাগানের ওপর ঘুড়ি উড়াতো ; নতুন্পাড়ার মালিবৌ মাদারের গাছে ঘুটে দিতে দিতে হাত শক্ত করে ফেলেছে কতকাল ; মাল্পুকুরীর সোতায় কেউ মোষ চরাতে গিয়ে হাওয়ায় উড়ন্ত গামছা সরিয়ে দূরাগত উড়ন্ত ধুলোর  পানে চেয়ে দেখে ; কেউ দুপুরের জলপানের খবর নিয়ে এলো কিনা ! গোটা  শরীরে কেরম অদ্ভুত বিদ্যুত্ খেলে যেত ; প্রথমবার বাঁধনছাড়া মনে হত ; মনে হত ঘুঘুমারির পাঁচ ক্রোশের দহলা পেরিয়ে যাওয়া যায় চৈত্রদুপুরে কেমন অজানা কোনো বাতিক মাথায় নিয়ে। এইসব কালা ঘোড়া - ফ্লোরা ফৌনটেন - কোলাবার ধারে যত মাছধরা নৌকো দাড়িয়ে থাকে সকালবেলা - ক্লান্ত - মৃত মাছের আঁশটে গন্ধ নিয়ে - বোম্বেজুড়ে যত চাকুরিজীবি - যত আমলা যত ব্যতিব্যস্ত জনতা ঘুমভেঙে অবলীলায় যাবতীয় ভালোলাগা তোরঙ্গে তুলে রেখে ব্রাশ করে - স্নান করে চুল আঁচরায় - দুটো মুখে দিয়ে কাজে বেরোয় আর সব ভুলে - সেই সব ছাপিয়ে আমি সক্কালবেলার বারাপাওয়ে কামড় দিই ; কোথায় যেন কবেকার ফেলে আশা চৈত্রদিনের পলাশের হওয়া এসে দোলা দেয় - এইখানে পৌষ জুড়ে সারাবেলা। বিকেল হলে সমুদ্রের ধার ভালো লাগে। এখানে নীল নয় জল একটুও। অনতিদূরে সীগাল-এর দল হাঙ্গামা করে - ঝপ্ করে জলে পরে ভাসতে থাকে। প্রথমবার আমার সমুদ্র এই আরবসাগরের ঢেউ এইসব একবিংশের দুষিত তট ; ভেনিসের নীল নিয়ে আর ক্যারিবিয়ান সাগরের জলোচ্ছাস ভেজা নুড়ির মত কিশোরীর প্রেমের গল্প হয়নি কখনো। আবার বছরপর এইখানে আমার  অবচেতন জিজ্ঞাসা "আমায় চিনেছ আকাশলীনা ?" কোথায় দূরে মিলিয়ে গেছে।

এত বৃহৎ আকাশে মিলিয়ে যাওয়া জলরাশি দেখে ভয় হয় নিজেকে হারিয়ে ফেলবো ভেবে। সেবার দুয়ার্সিনি যাত্রা রুবাইয়াত ও অনেকে। লঙ্কা নামের ড্রাইভার। রাতে এক ঘরে বসে সে তার শিশুর কথা শোনালো - পৃথিবীর আর সবার মত সেই হতভাগ্য দরিদ্র মাতাল চালকের গল্প শোনার রাত্তির শেষে ঘুমিয়ে পড়েছে লঙ্কা ; খাবারের ডাক পড়লে তাকে আর ডাকেনি কেউ ; আমরাও না ; গল্প শেষে যে যার মত ভুলে গেছি। রাতের খাবার  শেষে  সিড়ি  বেয়ে দোতলার ঘরে উঠব বলে চাদর জড়ানো শীতরাত্তিরের লঙ্কার লাল চোখ দেখে  আমার  ভয় করেছিল বড় ; বিস্মৃত হওয়ার যন্ত্রণা সারা পৃথিবী জুড়ে !একটাও কথা না বলে মাথা নত করে সরে গিয়েছিল।  এই আরবসাগর বড় মহান। কিচ্ছু মনে রাখার তাড়া নেই তার ; আফশোস নেই বিস্মৃত হওয়ার ! যুগের পর যুগ উপল খন্ডের ওপর নোনা বালু কোথায় হারিয়ে যায় কেউ মনে রাখেনা !  বিন্ধ্যপর্বতে প্রথম বেগনভলিয়া ফুটেছিল যেদিন দহিসার নদীর সুরমাই প্রথম ডিম দিয়েছিল ; যেবার দন্ডকারন্যে রাক্ষসের ঘুরে বেড়ানোর  গল্প - বাল্মীকি  রামায়ন লিখল - যখন শিবাজি আপেলের ঝুড়ি চড়ে জেলছুট হল; বিজাপুরে-গোলকুন্ডায় প্রথমবার সোনার খনি আবিষ্কারের ক্ষণে - প্রথম দুর্গের  ভিত বসানোর দিন এই মহাসমুদ্র সব চাক্ষুষ করেছে। সন্ধে নেমে এলে মেরিন লাইনস ধরে নোংরা নোনা জলে পৃথিবীর নিষ্পাপ শিশুর দল বিশ্বায়িত বহুজাতিক পলিথিনের জঞ্জাল ওলটপালট করে ; তট বেয়ে সারি সারি গগনচুম্বী - এইসব দম্ভের শতাব্দী যারা রচিত  করেছে প্রাচুর্যের পৃথিবীতে শিশুকে অভুক্ত রেখে , ইতিহাসে তাদের পরিনাম লেখা আছে। অন্ধকারে সীগালের দল হঠাত্ কঁকিয়ে ডেকে ওঠে। সুজন জানে সমুদ্র বিদ্রুপ করেছে !

মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৫

কৈফিয়ৎ-নামা

জয়ন্তী পাহাড় হতে মৌসুমী মেঘ নেমে এলে আমার কষ্ট হবে বলে ঘর ছেড়ে এলুম। পলেস্তারাহীন নগ্ন দেয়াল ; একটা এঁটো  চায়ের কাপ ; বহুজাতিক ভোগবাদের শহরে কিছু ঠিকানাবিহীন চিঠিজমা-টেবিলে আর কোনদিন কবিতার ডানা মেলবনা এলোমেলো। তাই ব্ল্যাকআউটের রাত্তিরে পথে নামলাম ; বৃষ্টির মরশুমে ঘরময় তোমার কথা মনে পরবে বলে। সারাগ্রাম ভরে মেঘ নেমে আসে ; কখনো মনে হত সেইক্ষণে তোমায় ডুয়ার্সের অর্কিড দেখাবো অথচ ঝড়  আসার আগের মুহূর্তগুলোয় একলাই রয়ে গেলাম। এই দেখো আর একটুও কাব্য নেই আমার কথায় ; ঘুমভেঙে আর একটাও কবিতার ধারণা নিয়ে উতরোল হইনি ; কবিতা দিয়ে তোমায় আদর করতে চাইনি । স্নেহ নয় - প্রেম নয় - অভিমান নয় ।  হঠাত্ কোনো আলুথালু দিনে একটাও পরিচিত ঘ্রাণহীন শহরে আমার কষ্ট হবে বলে ঘর ছেড়ে এলুম। এইবারে কারো পিঠের ওপর যেখানে স্বযত্ন তিল আছে , আমি কান পেতে সেইখানে কোনো জীবন্ত নারীর হৃদকম্প শুনব , কোনো কবিত্বহীন  দিনে। আমরা ভালবাসা'র চাইতে 'ভালবাসার ধারনাকে' খুব বেশি ভালবাসি বলে এইসব বুদ্ধিদীপ্ত সাহিত্যহীন  সময়ে কাব্য দিয়ে নয় , তোমায় স্পর্শ করে বুঝে দেখব ; তোমায় স্নান করিয়ে দেব - ভাত মেখে দেবো - উত্তরের খোলা দিগন্তে বসে চুল বেঁধে দেব - তাই ঘর ছেড়ে এলুম।  

রবিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৫

বহুবচন


কারা যেন রোজ এক একটা রং নিয়ে এসে গায়ে পরিয়ে দেয়। সেই কবেকার প্রস্থর যুগ - তাম্রযুগ ; যেদিন মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখল ; যেদিন প্রথম ছবি আঁকলো - গান গাইল সেই প্রাচীন হতে প্রাচীনতম বিস্মৃতির আড়ালের সময় থেকে এক একটা আমি উঠে আসে আর রোজ ওতে কারা  যেন এক একটা ডিসক্রিট রঙ লাগিয়ে দেয়  ; এক একটা ভিন্ন সুগন্ধি কি দুর্গন্ধদ্বারা আলোড়িত করে ! নিজের মধ্যে ভাগ করে করে অনেকগুলো আমি তৈরী করে দেয়। তারপর সন্ধ্যে  হলে আমায় হতভম্ব করে একত্রিত হতে বলে নিজের মাঝে ; রঙের আগের রংহীন আমি হতে বলে ; নিজের স্বকীয় ঘ্রাণ খুঁজে নিতে বলে ! সেবার শৈশব থেকে পালানোর পথে ভাবলাম মুখোশটা ফেলে এসেছি ; ওমা ! যেমনি খুঁজবো বলে পিছুপথ নিলাম তো দেখি গোটা পথে মুখোশের মেলা বসেছে ! কোনটা নিজের কোনটা নিজের নয় ভাবতে ভাবতেই বেলা নেমে এলো ! 

মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৪

ডিসক্রিট




একজন অফিসফেরত আরেকজন টিউশন পড়ায়। দুজনের প্রথমবার দেখা হওয়াটা একটুও কাব্যিক ছিলনা। কেউ কারো চোখ ভালবাসেনা এখনো হয়তো। অফিস শেষে ঘরে ফিরে রান্না বসায়। মাঝে মাঝে টিউশনের চাপ কম হলে অথবা কোনো ঝড়বাদলের দিনে অথবা শনিবার রবিবারগুলোয় একসাথে রাধে তারা। বেশ ক'বছর হলো অথচ একদিনও কাউকে আদর করে ডাকবার সাহস হয়নি কারো।  মাঝরাতে কখনও শরীরের  আঁতাতে নিঃশব্দ চুমু আর কানের পাশে উষ্ণ নিঃশ্বাসগুলো কেমন যেন ইশারায় সব বলে দেয়। সেইসব কলেজের দিনে তাদের প্রথমবার দেখা হওয়ার অনেক পরে তারা দুজনে প্রথমবার একলা কোথাও বেরিয়েছে। তার কত আগে কনট্রাসেপ্টিক - অদ্ভুত মুখ করা ফার্মাসীর দোকানদার - কন্ডোমের প্যাকেট কিনে যার যার প্রেমিক প্রেমিকার দেহমিলন অথবা একরাত্তিরের অনুগল্প কিংবা উপন্যাসের ক্ল্যাইম্যাক্স -  সেসব বহুবার যার যার মানুষের কাছে মদ খেয়ে ছড়ানো - জয়েন্ট রোল - বিছানার চাদর রোল - তারপর হঠাত গোটা সম্পর্কের উঠোন জুড়ে চীত্কার করে কেউ বলে উঠলো "প্যাক আপ !!"
শেষ বর্ষা এল ; এক একটা শুস্ক বালিয়াড়ি  পেরোলে আমরা সবাই ভিজতে ভালবাসি ; যাবতীয় বালি - বগলতলা জুড়ে জমা ময়লাগুলো ধুয়ে ফেলতে ভালবাসি তাই সবাই খুব ভিজলো।  কতক জল টিনের চাল থেকে পড়ে - কতক গাছের পাতা থেকে - কিছুটা ল্যাম্পপোষ্টের গা-বেয়ে - কতক শূন্য হতে নেমে যেমন একটা স্রোত তৈরী করে - সেরম আরেকটা স্রোত - সেরকম আরও কত - সেই প্রত্যেকটা ডিসক্রিট স্রোতেরা মিশেছে  বড় নালায়। আর নয় আর নয় করেও দুটো ট্রলি একটা সুটকেস মিলিয়ে ঘর হল দুজনের - নাগেরবাজার বড় রাস্তার ওপর ব্যালকনি। অন্তর্বাস পরে দিব্যি ধুমপান করা যায় এ -ঝুলবারান্দায় রাত হলে। শোকার্ত কোনো জোছনার পর যেমন আমাদের কোনো জৌলুসহীন বস্তুকে কেবল পুরনো শুধু একারনেই ভালোলাগে -তেমনও কোনো রাতে কেউ ভাবতে বসে - সম্পর্কজুড়ে কাব্যিকতা ছিল কি ! আসলে কাব্যিকতার সংজ্ঞা বড় বায়াসড কিংবা শ্রেণীসচেতন আর নাহলে বড় জৌলুসময় ! ভেবে বললে বরং  ভয় ছিল বলা যায় ; দুটো ক্ষুধার্ত কুকুর পরে থাকা একটা পাউরুটির টুকরো দেখে যেরম একে অন্যকে  ভয় পায় সেরকম ভয় ছিল  - ভয় ছিল বিছানা বদল নিয়ে - সত্যিকারের পুরোনো জিনিসে প্রাচীনত্বের মায়া হারানোর ভয়। তবুও যে  বিশ্বাসে লোকে খাবার ঢেকে রেখে কাজে বেরোয় - ন্যাংটো হয়ে জামাবদল করে আরেকজনের সামনে - সে বিশ্বাসেই  ঘর হয়ত । মার্চের সন্ধেয় ছাদে মিষ্টি হওয়া দেয় উত্তর কলকাতায়। তারা চা খায় চেয়ার দুলিয়ে ; পাড়ায় পাড়ায় আরেকটা গজানো অসন্তোষ - দেশ জুড়ে বড় হওয়া - দ্বেষ জুড়ে বড় হওয়া মিথ্যে কথারা গলির মোড় পেরিয়ে তাদের দরজার পাশে অপাংতেয় লেটারবক্স অবধি পৌছনো এযুগের সিন্থেটিক না-পাওয়ার বেদনারা হাঁসফাঁস করে। রোজকার চায়ের দোকানে কাস্টমার দুইখান তৃপ্তিসুচক শব্দ করে চুমুক দিয়ে - গল্প করে - চা-ফুরোলে টাকা দিয়ে পালায় - চায়ের দোকানদার - এঁটো চায়ের কাপ - স্তূপাকৃত চা-পাতার ডাঁই ভুলে যায় সেরম আনুষ্ঠানিকতার গল্প হয় দম্পতির। অতঃপর আবার ভয় পাওয়া - ছুটতে চলা।  কারো পেছনে ছুটছে নাকি কারো তাড়ায় কিচ্ছুটি বোঝার জো-নেই। রাত্রির নাটক শেষ হলে আচমকা স্বপ্নের মত বান আসে। তাদের সংসার জুড়ে যদি কখনো তৃতীয়জনের আকাঙ্খা থেকে থাকে - অবচেতনতার ওপার থেকে সেই তৃতীয় স্বর শোনা যায় - ক্রন্দনরত - যে শিশু খেলতে ভুলে গেছে খেলনার ভিড়ে - জৌলুস আর রঙিন পৃথিবীতে - তার ক্রন্দন। এক একটা দশক এক একটা শতক জুড়ে মিথ্যে কথারা - এক পা এগোতে গিয়ে দু'পা পেছনোর খেলা এখনো সাঙ্গ হয়নি যে  প্রিয়তম  !

শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৪

নক্ষত্রবাস্







আমার ঘরের  ভিতর অব্যক্ত খোলা চিঠিরা এলোমেলো উড়ে বেড়ায়। গজেন্দ্রপুর  চৌরঙ্গি'র চায়ের দোকানে পেট্রোম্যাক্সে  হাওয়া দিতে দিতে দোকানিটা অদ্ভূত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছিল ; বাক্সজুড়ে নারকোলের নাড়ু আর কুলের আচারভর্তি ডিবেটায় নিজের ছবি দেখেছি কি মনে পড়েনা খুব, ঘর ছাড়ার মরশুমে ! প্রকাশদাদা বাঁশবাগান ঘেরা আমির পুকুরে মাছ ধরত ছিপ দিয়ে ; নিজের ছায়া চিনত বসে বসে - ফাতনার ওঠানামা কেমন ঢেউ খেলাতো তার পাঁচদশকের পুরোনো  কিছুই না-পাওয়া মুখে। সেবার নাগেরবাজার ফেরৎ অটোয় এক হিন্দিভাষী যুবককে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখছি ; কানের পাশের শিরাগুলো ফুলে উঠেছিল তার ; ডপকা মুসাম্বি ছুরি দিয়ে কাটলে যেরম গলগলিয়ে রস বেরোয় চোখগুলো ঠিক সেরকম ; অটোর সার্সী জুড়ে ব্যস্ত শহরটায় কারো সময় হয়নি ফিরে তাকানোর। তাতাই বলে বাড়িতে তার পাশে কেউ শুতে চায়না ; সে নাকি বেড়ালের মত গুটি মেরে গায়ে লেগে থাকে। মাঝরাতে মা বিরক্ত হয়ে ঘুম থেকে উঠে বিছানা বদলায় আর বোনের মেজাজ। খুব ছোটবেলায় হাফপ্যান্ট পরে যখন মামাবাড়ি যেতাম , তল্হিকুরায় হাটুজল ভেঙ্গে সোতা পেরোতে হত ; সোতার জলের ওপর ধানের শীস জুড়ে ফড়িং উড়ে বেড়ায় ; একবার ফড়িং ধরতে গিয়ে নিজের মুখখানা আরেকবার দেখেছি। আলেক্সেই মেরিসিয়েভের গল্প আমার কক্ষনো ভালো লাগেনি বরং সেই গল্প জুড়ে আষ্ঠেপিষ্ঠে যে উইলো পাতার রং বলা আছে যে মেয়েটি যুদ্ধে মুখপোড়া সৈনিক'কে কখনো দেখেনি অথচ তাকে প্রেমপত্র পাঠায় ; গুজবেরির ঘ্রাণে যার শৈশবের কথা মনে পরেছিল প্রবাসে ; উক্রেনের যুদ্ধবিদ্ধস্ত পুরুষহীন গ্রামে ঘরের মেয়েরা যেভাবে হঠাত খুঁজে পাওয়া এক অনাহারক্লিষ্ট নিখোঁজ বৈমানিকের নগ্ন  পুরুসাঙ্গে দৃষ্টিপাত করেছিল সেইসব ; অনেকখানি  সন্ধ্যেবেলার রুপকথা জুড়ে পুকুরের তলা থেকে কৌটোর ভিতর ভোমরার খুনের দৃশ্য আয়নায় আরেকটা বিম্ব রচনা করে। জৈষ্ঠ্য মাসের দুপুরে সদ্য স্নান সেরে এলে তোমার কপালে ঘাম জমে গড়িয়ে পড়লে আমার মনে হয় আমিও গড়িয়ে চলি ; গাল -গ্রীবাদেশ পার হয়ে সুগন্ধীমাখা রুমালের মত তোমার বুকের গন্ধ পেলে আমি রুমালের গন্ধটাকেই ভালোবেসে গড়িয়ে চলেছি। সেই ঘামের বিন্দুর ভেতর নিজের ছবি দেখব এবার। পুবদিকের দেয়ালে ঘরের ভেতর যে অজন্তা ঘড়ি ছিল কালো রঙের , গত পঁচিশ বছর একটুও অনিয়ম নাহওয়া এক টেবিল এক চেয়ারে কাটানো  কেরানীর চাকরি করা বাবার রবিবারগুলোয় সেই ঘড়িটা থেমে গেলে আমার ভয় হত , খাটের ওপর জলচৌকি উঠিয়ে আমি তার ওপর দাঁড়াতাম - ঘড়ির কাছে কৌতুহলে মুখ নামাতেই নিজের মুখ দেখা যায় ডায়ালের কাঁচে। আমি তখন সময়ের কথা ভুলে ঘরটায় দৃষ্টিনিক্ষেপ করতাম। ওপর থেকে দেখতে অন্যরকম লাগে রোজকার একক দিনযাপনে । তারও কতদিন পর অন্ধকার রাত্তিরে লোডশেডিং হওয়া শহরে  আলো নেই ভেবে যখন পথে নামলাম তোমার হাত ধরব বলে নিজের প্রতিফলনহীন রাস্তায় , চেয়ে দেখি শুকতারা বড় উজ্জ্বল  ; সপ্তর্ষিমন্ডল    যাকে আর কখনো দেখিনি সেও বড় জমকদার সেই রাতে। আলো দেখে ভয় হয় আমার - ভীড় দেখে । ভেবেছি কোনো একদিন পথ হাঁটবো , প্রতিফলনহীন শহরে , প্রত্যেকে তার তার মত জনতার ভীড় ।  আবার হয়তো সেই জলচৌকির ওপর উঠে একদিন দেখব সমস্ত ঘড়ি থেমে গেছে। একে অন্যের মত নেই আর কেউ। আমি রুমালের ঘ্রাণ ভুলে যাব ; তোমার বুকের ভেতর রক্তমাংস বাদে যে আরেকটা তুমি লুকিয়ে ছিলে তার সুবাস নিতে নন্দনপুর - খয়েরবারী থেকে এক একটা আমি নেমে আসব ; যেই পুকুরের ধারে প্রকাশদাদা  মাছ ধরত সেইখান থেকে ; আর আমার ছোটবেলার প্রত্যেকটা রবিবার থেকে আমি আসব । আমরা ঘর বাঁধি ; একটা ঘরের ভেতর আরেকটা ; একটা মিথ্যে দেয়াল দিয়ে প্রলেপ দিই । একটা ফেলে আশা হারিয়ে যাওয়া চিঠির পাতা দিয়ে আরেকটা প্রতিফলন বানাই। তারপর মাঝরাতে ম্লানতম নক্ষত্রের আলোয় সেসব উবে গেলে আরেকটা গল্প  আঁকড়ে ধরি  কোনো অনিয়তাকার ভুলেযাওয়া নিয়ে ।

রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৪

পাতা খসানোর দিনরাত্রি


দুন্দুলের পাতার ভিতর যত ইতিহাস লেখা যায়
তার চেয়েও ঢের বছরের কথা ঝরে পরে আছে 
আকন্দের ঝোপে - শিরিষতলা - কাঠগোলাপের বাকলে ;
সারাটা পৌষালী  দুপুর উঠোনে পায়রার দল 
ধান খোটে - পাঁকশালে শিলনোড়ার শব্দময় 
আম্মুর হাতের তালুতে মশলার গন্ধভরা 
উত্তুরে হওয়া কবেকার জাতাকলে 
সোনামুগডাল ভাঙ্গে - অণুগল্প শোনায় ;
আরেকটা দশক -তারপর আরো বছর কুড়ি 
গৃহস্থের স্বচ্ছলতা বয়ে ঠাম্মার যৌতুকের মাকড়ি - পেতলের বাটি - পানের বড়জ 
সব্জিক্ষেত ভাগ হয়ে গেল 
তিনপ্রানির ফ্ল্যাটতলায় নতুন গাড়ি এলে যে মেজাজে ফুরফুরে হাওয়া বয় 
সেই একই অভিপ্রায় - সারাগ্রাম শাপলার ফুল - তেজপাতা - ধানিলংকার চাষ করে 
বড় হয়ে টাকা ফলাবে - টইটুম্বুর সংসার যারতার !
বাড়ন্ত একান্নবর্তী - কবেকার পুরাতন ; ভেঙ্গে গেছে। 
নিজের নিজের আখের গোছাতে - দুচোখে দোতলা বাড়ির স্বপ্ন 
জৈষ্ঠ মাসের বষ্টুমি আর কক্ষনো গান গাইতে আসেনি 
ভিড়ার ধোঁয়া দিগন্ত ছুঁয়ে এলে শুকতারার আলো ম্লান - আরও ম্লানতর 
বহুজাতিক ধান্দাবাজের কানে রাতপাখি থেকে গেছে শুধুই রাতজাগা পাখি হয়ে

তোমারও মনের মত কোনো একাকিত্বে 
ধনতান্ত্রিক আদরেরা 
বারবার বহুজাতিক জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রেম হয়েছে কি জানা নেই !

ভালো থাক খাপু পাখির গান 
আবার কোনো বিকেলে নগ্ন পায়ে 
পশ্চিমের মোথা ঘাসের মাঠে তুমি দাঁড়ালে 
আমি শিশ্নের অভিশাপ ছাড়াই খুশি হব জেনো 
"একদিন যে দোতলা বাড়ির স্বপ্ন দেখেছি , সেই বাড়িটাকেই বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে চাই। "  

বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

হোককলরব


সেই লক্ষ জনতার মিছিল আমার জীবনের !
সেই লক্ষ জনতার মিছিল আমার মৃত্যুর !
সেপ্টেম্বর কুড়ি , শহর নেমেছে পথ ভাঙ্গবে 
বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে স্লোগান আঁছড়ে পড়েছে মায়ও রোডে 
কমরেড ব্যারিকেড গড় ; ব্যারিকেড !
রাজপথ তোমার আমার ;
কলকাতার গাঢ়তম  লাল ফুল ফুটবেই !
কলকাতার দৃঢ়তম  মুঠোবাঁধা 
সেই লক্ষ জনতার মিছিল আমার জীবনের !

শাসক-শাসক-অপশাসক তুমি নিপাত যাও ,
লক্ষজোড়া হাত একসারে 
মহানগর জুড়ে সাহসী কথারা 
ভয় কাটুক ; ভয় !
সারবন তোমায় ভুলিনি, 
বৃষ্টি ছাপিয়ে মায়ও রোডে স্লোগানে 
কলকাতার দৃঢ়তম ব্যারিকেড 
কমরেড , অদ্ভূত নিশ্চুপ এ-শহরে 
কলকাতার  গাঢ়তম ফুল হয়ে ফুটবেই !!

মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৪

অনু বলেছিল


অনু বলেছিল থেকে যাও জ্যোতি
এবারে সাদার্ন য়াভুন্যু জুড়ে কৃষ্ণচূড়া ফুটবে ঢের 
আবার কার্তিকের দিন এলে পাতাখসা আমলকি ডালে ঘুঘু ডাক দেবে 
কলকাতায়  শান্তি নেই 
ট্রামের তার 
কালো 
দেয়ালে টিকটিকি 
আর আস্তাকুঁড়ে  ক্ষুধার্ত কাঁকের গোগ্রাস শুধু 
তবুও জুলাই এলে বৃষ্টিভেজা রেড রোড জুড়ে হাঁটবো বলে থেকে যাও 

ঘুমের দেশে অবচেতনে 
এ শহর ভালো লেগেছে কি 
কে  জানে তা 
পথ খুঁজিনি - দীর্ঘকাল কম্পাস দেখে  দিনগত 
 সে ভ্রমও হয়নি 
তবুও ভাল্পারাইজো নেরুদার কফিহাউস আর এপ্রিলে  কলকাতার দুপুরে 
সদ্যজাতের মত মায়া নিয়ে থেকে যাও 

ক্ষনিক উতবৃত্ত সময়ে 
অশ্বিনী নক্ষত্র ওঠে পূবে 
অধিকার কবে কার কে খোঁজ রেখেছে তা ;
ছায়াপথের বয়স বাড়ে 
বক্শা পর্বতের নিস্তব্ধতা নিয়ে 
ঘাম জমে ওঠে নাকের ডগায় ;
আর  পাঞ্জাবির হাতায় 
ছেঁড়া পকেটে দিনশেষের মলিনতা ;
সেই থাক বড় হয়ে।  

একদিন ব্যারাকের পুরনো দেয়ালে 
কবিতা খুঁজতে  বেরোবে 
ভুলে যাওয়া কোনো এক অখ্যাত গ্যারিসন সৈনিকের  - প্রবাসে 
'হাথ্রনের ঝোপের রহস্য আর উইলো পাতার ঘ্রাণে '
এ শহর  জুড়ে  আরেকটা শহর 
আরেকটা হারিয়ে যাওয়া নেরুদার পদ্য 
কালো পিচরাস্তা থেকে জেগে ওঠা আরেকটা সারিয়ালিস্ট দেশ খুঁজবে বলে 
অনু বলেছিল থেকে যেতে।


- দেবজ্যোতিকে 

রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৩

সুদিন কাছে এসো .

১.
রাস্তাজুড়ে  প্রহরীর মতন  সারি সারি হোর্ডিং  আর রং বেরঙের  আলোয় 
শারদীয় জনতা  ঘরে ফেরে 
ভোরে।
বনের পাখির ডাক  ফুটপাথ  এর গাছে - ট্রামের তারে -
পুরনো বারান্দার ভাঙ্গা রেলিং -এ  - 
আর ট্রাফিক সিগনাল এ -
যে  শিশু  আজও রাতে অভুক্ত ,
কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পরেছে 
পথপাশে  -
কুঞ্চিত চর্ম কঙ্কালসার বৃদ্ধের কপালে যে ঘাম জমে ওঠে 
আর আস্তাকুঁড়ে - নর্দমায় - গুটি  মেরে বসা লোমহীন কুকুরের 
গন্ধের  সাথে মিশে যাওয়া নিশ্বাস তার 
ম্যাডক্স -এর আলো - দেশপ্রিয়র অম্লান রোশনাই ছাড়িয়ে যায় -
হাই তোলা - ঘুমচোখে বেলুনওয়ালা  -
ভেপু তার বিক্কিরি  হয়নি  সব  তাই  জনতার ভিড়ে ভেপুর ব্যাপারী 
নতুন কিছু খোঁজে ।

২.
তারপর ,
প্রত্যেকটা অভুক্ত জঠর 
প্রত্যেকটা ক্লান্ত শরীর 
প্রত্যেকটা উত্সবহীন  নশ্বর দেহ 
"মহানগর , আমি পরাজিত "  - বলতে চেয়েও 
"তোমার শহর , আমার শহর " - এর কোলাহল ছাড়িয়ে 
আরেকটা বৃহৎ উত্সবের স্বপ্ন দ্যাখে ;
আর সেই গান মুখরিত হয় 
প্রত্যেকটা একক ফুটপাথে -
অন্ধকার গলির বিড়ির ধোঁয়া আর কাশিতে -
একবিংশের প্রত্যেক উদ্বাস্তু-অভুক্ত জনতার হৃদয়ে ,
"সুদিন কাছে এসো   ...." !

শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৩

আরেকটি ভাঙ্গনের গল্প ...


১.
চর নন্দনপুর - মান্দালঘাট  - বোয়ালমারী জুড়ে
সেবার  দেশভাগের ঢেউ  !
তিস্তার  ধার  বেয়ে  লোকে আবার ঘর  বানিয়েছে 
বানিয়েছে চাষের  ক্ষেত 

ফেলে আসা  দেশের  স্মৃতি নিয়ে -
আর  হোগলার  বন  কেটে  কেটে - 
আরেকটা সিঁদুরে  আমের বাগান -
আরেকটা ঘাট বাধানো পুকুর  - তালসারী - বাঁশবন 
গৃহস্থের নতুন স্বপ্নের  ঘোরে 
আরেকটা রাজশাহী -
আরেকটা খুলনা -
আরেকটা ডোমার -
আরেকটা মৈমনসিন্ঘা  পাওয়ার অবচেতনতা তবুও মিলিয়ে গ্যাছে উত্তর তিস্তা আকাশের  ধ্রুবতারায় !!


২.
পূব ঘরের পাশে গোলা ঘর ছিলো  - ভর্তি  ধান  - চৈত্রের  রসুন  -
আর  একেক  আট -দশ কিলো  কুমড়ো  এ  ভরা  বছরভর ;
দক্ষিনের আদার বন  আর হলুদের ফুল কবেকার এক শান্ত দুপুর  -
                             পাঁক -শালে  ধোঁয়া  -
                             পাশের কাটাল  গাছ  -
                             একটা বেড়ালের ডাক  -
                             উঠোনে শুকোতে দেয়া ধানে পায়রার  ঝাঁকের মতই 
                             পালিয়ে যাওয়ার গল্প  এগুলো !
গোয়ালের গরুর পাল আর দুটো মোষ  নিয়ে যে ছেলেটা শীষ  দিতে দিতে চরাতে যায়  মাঠ তিস্তার কাশবন  -
আকাশ নেমে আসা মেখলিগঞ্জের দিকে -
শুনেছি  সে কেরলায়  আছে , ইটভাটা  খাটে ;
যেবার প্রথম পাম্প -সেট  এলো কিংবা পাওয়ার -টিলার  - বাড়িতে  -  সে সব কটা  দিন স্পষ্ট ,
ওই বাঁশবনের  ভেতরে যে রাস্তা চলে গ্যাছে বক্সীগঞ্জ , ফাল্ল্গূন-এর উদাম দক্ষিনার  মধ্যান্যে
যে ভাঙ্গা-লোহা কৌটোর ব্যাপারী-টা  আসে , সে কিনেছে সেই সব লোহালক্কর কেজি দর-এ !
আর কলার বাগান - সুপুরি বাগান - পুকুর - তেজপাতা গাছ -
নলপুকুরের  মাঠ - সবকটা আম - ঠাকুরদা যে লিচু কলম বুনেছিল সেইগুলো -
গরুর পাল - এমনকি থালা-বাসন -রান্নাঘর  -
যে পীড়ি-তে  বসে বাড়ির 'কামাল ' থেকে  প্রত্যেকে  খেতো  -
সেই সবকিছু ভাগ-বাটোআরা হয়ে গ্যালো ! 
মোষের দায় কেউ নেবেনা তাই বেচে  দিয়েছিল মোহিত্নগরের হাটে -
টটে  বুড়ো  জানে তার হাতে বড় হওয়া মোষ  কেঁদেছিল বড়।
আর সে রাতে নন্দনপুর  - মান্দালঘাট-এ পাট-ক্ষেতের  আল  জুড়ে -
প্রত্যেক দুর্বা ঘাসে ঘাসে সেই ক্রন্দন শিশির হয়ে ঝরেছিল এই বিচ্ছেদের-শতাব্দীর জন্মলগ্নে । 

৩.
দেশ ভাঙ্গে -
ভাঙ্গে নদী -
তারপর  এই  প্রেমহীন  শতক 
পৃথিবীর  সবকটা  একান্নবর্তী -পরিবার ভেঙ্গে উদ্দামতায় নাচে  !
জয়ী , তোমার মনে ক্রন্দন নেই  - নেই এপ্রিলের কাঞ্চন ঝরে  গ্যালে বেদনা ;
মিছে ভাবি ,
"সকলের তরে সকলে আমরা ......" -
দূর  !!! শিশুপাঠ  কেউ পরেনাকো আজ ।