রবিবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৬
শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০১৬
নিজামির গল্প আর ধওলিয়া
১২:১১:০০ AM / by কমলেশ /
No comments /
১
‘হারামজাদা , বাটপাড়ের পো বাটপাড় , আমার পুশ্যিরে নিলি , আমি এইবার তুরে মন্তর দিমু , মন্তরে মন্তরে তরে শুঁকায় খাল বানায় দিমু , খালি চরা হইয়া পইরা রইবি , উরে হারামির হারামি নদি , সাগরে যা তুই, সাগরে যা , সাগরে যাইয়া তেজ দেখা তুর দেখি কত্ত বড় বাটপাড় ; সাগরে যা হারামজাদা !’
১২/০৮/১৬
শনিবার, ২৫ জুন, ২০১৬
হাকিমতপুরার রেলগাড়ি
৫:১৯:০০ PM / by কমলেশ /
No comments /
উটপোকা
৫:১৮:০০ PM / by কমলেশ /
No comments /
.
এই হলো উটপোকা। এরে উটপোকা নাম কে দিলো সেইটা বলা মুশকিল। উটের সাথে আজন্ম কোনো লেনাদেনা তো দেখি নাই ! উটের গায়ের রং এই কীটের ধারেকাছেও না ! মাইনষের পোলাপানের বড় সাধ উটপোকা পোষার ; আসলে তারে পোষ্য কওয়া যায় না ; ধরেন 'উড়ানফন্দি' নাম দিলাম সেই কায়দাটার। উটপোকার মায়ে মাটির বাসা বানায় আর তার ভিতর ডিম দিয়া কই যায় কে জানে। সেই ডিম জোয়ান হইলে ডানা লইয়া মাটির গুটি ফাটায় ফরর-ফরর করে উড়ে । আর উড়ানফন্দির পোলাপান একদিন-দুইদিন-তিনদিন সবুর কইরতেই থাকে উটপোকার বাচ্চা কবে বাইর হবে এই ধান্দায় । বাচ্চা ধরা তো মুখের কথা নয় ! বাচ্চা ধরে , তার কোমর আর মাথায় রেশমি সুতা লাগায়, দুই একটা হুদাই ফাঁকা ডেমো শেখায় - সে প্রচুর হ্যাপা। আসল মজা তো তার পরে যখন সেই বান্ধা উটপোকারে কওয়া হবে 'উইড়্যা যা ,যাহ বাচ্চা , উইড়্যা যা !' , বোঝো ঠ্যালা !! মরন !
যাই হোক , আসি নাম-এ , এইরাম নামের কৌশল কিন্তু ভালোই বাড়সে পুরানপল্লীর ঘরে ঘরে। মিড-ডে মিল-এর ধান্দায় যেকটা বাচ্চা নুরুলের টারির প্রাইমারি স্কুল যায় , তার মধ্যে যে দুইটার প্যাটের ব্যামো , প্রায় ক্লাস পলায় পেছনের বাঁশঝাড়ে মুখোমুখি বসে হাগে , সহজ পাঠের ক্লাস থেকে হরপ্পার ধ্বংসাবশেষ পড়ানো টানা দুই ক্লাস যাদের হাগতেই কেটে যায় বাঁশঝাড়ে , সেই দুইটার নাম হল ডালটন আর পাভেল ! হাঁ আলবৎ বাঙালির বাচ্চা ! আপনারা যে কয়টা পাভেল আর একটা ডালটনের নাম জানেন , তাগো ফুপাতো , চাচাতো , খালাতো কিচ্ছু লাগেনা এরা ! ঠিক উটপোকার নামের মতন কেইস !
সেইদিন 'উড়ানফন্দি'র উস্তাদমতন একটা মাইনসের শাবক , নামটা ঠিক মনে নাই , কারে যেন কইলো সেই গল্পটা । আসলে যে কয়দিন পোলাপান বাগড়া দিয়া উটপোকার গুটির পাশে বইয়া থাকে , সেই কয়দিনেই উটপোকা গুটি ফাটাবেই ফাটাবে ! কারণটা গুপ্ত অথচ অনেকেই জানে , তাই খোলসা কইরতে আপত্তি হওনের কথা নাই । মাটির গুটির ভিতর উটপোকার বাচ্চা তো কানা কিন্তু তার কান সজাগ। পোলাপান এইটার এডভান্টেজ নেয় পুরা। গুটির সামনে হরদম চলে গুল আর হাওয়া ভরার সেশন। সেই গুলে কি নাই ভাইরে ভাই ! গুটির বাইরেটা যে সত্যি সুন্দর , জনগণ এই গুল শুইনলেই একমাত্র জানতি পারে। ঢ্যামনা উটপোকা সেই পাম্প গেলে আর গুটি ভাঙার মনস্থ করে , হাঁ প্রি-ম্যাচিউর উড়ানের প্লান , ঠিক ঠাউর করসেন। তিনদিনে যদি গুটি সে ভাঙলো তো রেশমি সুতো পড়লো কোমড় আর মাথায় ! এইতো জীবন উটপোকার। এই ছবিটা পুরানপল্লীর প্রথম কানা উটপোকার, শোনা যায় এইসব কানা উটপোকার দল ভারী হইতাসে দিনদিন । 'উড়ানফন্দি' একমাত্র কানাদের সুতো পড়ায় না , কানা সুতোয় যা এমনিও তা !
রবিবার, ১২ জুন, ২০১৬
সুরাইয়া , তোমার বেহেশতের খবর আমি জানিনা
১১:২৯:০০ AM / by কমলেশ /
No comments /
পৃথিবীতে কিছুই নেই এমন আর
সমস্ত শরীর জুড়ে ভানহীন একটা দিন চাই শুধু ;
তাদেরও খোঁজ নেব ভরাবেলা মৃত্যুদিনের মতন বাঁচতে চাইব
মন্দাক্রান্তা
১১:১৪:০০ AM / by কমলেশ /
No comments /
ঘাসের ঘ্রাণের মত মৃদু সাঁঝ-ঝটিকার লতা ক্লান্ত গা ফিরিয়ে কবে থেকে শুয়ে পরে আছে
নিস্তব্ধ ;
বিভীষিকাময় মৃত্যুভয়ে দিন গোনে আমার গ্রাম !
পৃথিবীতে প্রথম যুদ্ধ ঘোষণার দিন
কাউনের ক্ষেতে পোড়াশস্যের ছাই ;
অন্তিম নিঃশ্বাসে গাঢ় ওম রেখে
মৃত নবজাতকের নিঃসীম স্তব্ধতায় শুধু বহুজাতিক আউশ বাড়ন্ত যৌথখামার জুড়ে !
এশিয়ার সবুজ মাঠে খিরকিন লোরচা লাঙ্গল দিয়েছে আবার –
শোকের গানের মত বীজ ছড়ানোর শব্দ ছাপিয়ে
বাজারের কোলাহল
কার্তিকের মাস এলে ধান ঝাড়াই-এর মরশুম ভর,
প্রাচুর্য্যের দেশে দেশে শিশু খুন হবে খুব অনাহারে ।
পার্থিব শ্লাঘাবোধে অরন্য কাঁদে তারপর – বনপাশে কারা যেন দাবানল দিল ভোররাতে !
তাদের সবার চুলের গন্ধের মত তাদের সবার তাকানোর ভঙ্গি এক , নিরবিচ্ছিন্ন এককভাবে তাদের সবার ভালবাসার গল্প রক্তাক্ত সঙ্গম ও সহজাত মিথ্যের গল্প
১০:৫৩:০০ AM / by কমলেশ /
No comments /
তাদের সবার চুলের গন্ধের মত তাদের সবার তাকানোর ভঙ্গি একরকম , নিরবিচ্ছিন্ন এককভাবে তাদের সবার ভালবাসা ও সহজাত মিথ্যের গল্প।
রোজকার হার্দিক বেশভূষা পরিত্যাগ করে আমরা পাশাপাশি বসি ।
মধ্যবর্তী দূরত্বকে সমঝে ওঠার আগেই শতাব্দীপ্রাচীন হিসেবনিকেশ রেখে দিই মাঝে ।
পৃথিবীতে সব প্রিয় বান্ধবীদের রঙ্গিন খামে পশমিনা পাঠানো হবে এইবার ,
পাঠানো হবে পশমিনা করে বাবলার কাঁটা ।
যারা ভোর হওয়ার অনেক আগেই নাভি তলপেট ডুবো জলে নাইতে নেমেছে , তারা মিথ্যে কথা বলবে ,
গাঢ় মিথ্যের প্রশ্রয়ে চুমু খাবে স্থলনের মরশুমভর ।
গ্রীবাদেশে কামড়ের লাল দাগ আর ফোলা ঠোঁটে অতঃপর সৌন্দর্য খুঁজবে জনৈক ;
মিথ্যের মত সুন্দর , মিথ্যের মত সহজাত ভঙ্গিমায় আমরা পাশাপাশি বসব আবার ।
গভীর রাতের মদ্যপ অটোয় এলোমেলো রাস্তা চলে , ক্রমাগত দ্রুতগামী গাড়ি চলে যায় বেপরোয়া ;
ক্রমশ আরও বিপরীতমুখী ।
একটা গাড়ি ঠকিয়ে আরেকটা টপকাই , জাহান্নমের শব্দময় লরিটাকে ভাঁওতা দিয়ে তার সামনে দিয়ে দুলে এগোতে থাকে অর্থহীন
অনুতাপহীন
ট্রাফিক জ্যামের মত সমস্ত পৃথিবী,
একজন আরেকজনের সাথে অদৃশ্য দৌড়ে নাম লেখাই,
সৌজন্যের ভান করি ।
মৃত নাজরীনকে আমি চিঠি লিখিনি,
মৃত আফরীন আমার চেনা নয়,
মৃত মরিয়মের মুখ আমি কখনো মনে করতে পারিনা ।
শনিবার, ১১ জুন, ২০১৬
ঈবলিশ মিঞা'র প্রলাপ
৪:৩৭:০০ PM / by কমলেশ /
No comments /
তারে ভাত দিমু - দহর কালা জলে মেঘ উঠি গেলে
সাজি মাটি দিয়া তার গতরে আঁকায়ে নিবো পাথর-যুগের মাশরুম
আন্ধারের মত মুখখান – পিঁয়াজের ওম ঠোটে ঠোটে ঘোরে
আমরা মিছা কথা কই
অগাস্ট মাসের পড়া ব্যালা তার হাতের তালুর ভাপ ওঠে কাউনের ক্ষেতের মায়ায়
অগাস্ট মাসের পড়া ব্যালা তার
চোখে
চোখে
ঘরছাড়া উচাটন
আমরা মিছা কথা কই ঈবলিশ মিয়াঁ
মিছা আদর করি ,
অচিন গ্রীবাদেশ
মিছা খুঁজি !
মঙ্গলবার, ১০ মে, ২০১৬
আসলে যুদ্ধটা কার সাথে ?
১০:১৮:০০ AM / by কমলেশ / in Bastar, Corporate Loot, Ethnic Cleansing, Gond Tribals, Hudson River, Inland Migration, Jamestown, Migration, Mohican, Pocahontas, State-Terrorism, Tribals of India /
No comments /
পৃথিবীতে মর্গের মত শীতল বিকেলবেলা
রবিবার, ৮ মে, ২০১৬
তোমাকে বলছি , তৈরী হও !
১০:১১:০০ AM / by কমলেশ /
No comments /
শনিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৬
হাকিমতপুর ডাঙ্গার গল্প
৬:১৯:০০ AM / by কমলেশ /
No comments /
ঝড় আইলো আইলো করে যে , দেখোনা ওই পস্ছিমদিক কেমন ম্যাঘ কালো হইয়া আসে।
বিকালভর গাঙ্গের জলে পা-ডুবাইয়া বইসা থাকো এইসময় ; পাটখ্যাতের মাথার উপর কালা ফিঙ্গা উড়ে আর বসে ; ঢিলাঢালা লুঙ্গিপরা হাবুলের পোলা নয়াচরের ঘাসবোঝাই ডিঙ্গা নিয়া ফেরে , দূর থ্য়িকা হাঁক দেয় একটা।
বৃহস্পতিবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৬
মাখমুদ স্ট্রীটের নিখোঁজ বাড়ি এবং একটি মিথ্যে গল্প
৬:৪৫:০০ PM / by কমলেশ /
No comments /
"So enter our houses, conquerors, and drink the wine
of our mellifluous Mouwashah. ...
Our tea is green and hot; drink it. Our pistachios are fresh; eat them.
The beds are of green cedar, fall on them,
following this long siege, lie down on the feathers of
our dreams. The sheets are crisp, perfumes are ready by the door, and there are plenty of mirrors:
enter them so we may exit completely. Soon we will search
in the margins of your history, in distant countries,
for what was once our history. And in the end we will ask ourselves: Was Andalusia here or there? On the land ... or in the poem?" - Mahmoud Darwish
হতাশ বার্ঘুতি আবার পথে নামল বিধ্বস্ত , কপালে ঘাম জমছে , আর কাউকে জিগ্গেস করার সাহস হয়নি তার , পাছে কেউ সেই ঠিকানার অনিশ্চয়তা সপাটে জাহির করে দেয় , সেই ভয়ে। সে হাঁটতেই থাকে , বাঁধানো সড়ক পার হয় , নিরুত্তাপ এগিয়ে চলে , প্রলাপ বকতে থাকে , বিড়বিড় করে নিজের সাথে ; তেমাথা চৌমাথার মোড়ে আলেপ্পোর গোলমরিচ ছড়ানো হালাবী কাবাবের গন্ধ নিবিড় হয়ে নাকে এলে সে গলা চড়িয়ে গাল দেয় , চিত্কার করে বলে কাবাবের খুশবুতে দেখো কেমন মানুষের খুনের গন্ধ ভরে , চোখ বড় বড় করে চারদিকে জোরে শ্বাস নিতে থাকে আর বিড়বিড় করে , ফিশফিশিয়ে বলে - গানপাউডারের ঝাঁঝাঁলো ঘ্রাণের গল্প শোনায় নিজেকে ; ক্রমশঃ নুড়ির পথ আসে , শহরের আলো পেছনে আরো পেছনে যেতে যেতে মিলিয়ে যায় , বার্ঘুতি তখনও চলতে থাকে।
"O land of ours ...
remember us now, wandering
among the thorns of the deserts
wandering in rocky mountains,
remember us now,
in tumultuous cities across the deserts
and oceans.
Remember us with our eyes full of a dustthat never clears in our ceaseless wanderings. " - Jabra Ibrahim Jabra
দারউইশ যেমনভাবে হাঁটত রামাল্লাহায় , তেমনটি আরো সহস্র হাজার নির্বাসিতের দল হাঁটতে আসে হেব্রণ , জাফ্ফা , রম্মতগন , রামাল্লাহা , নাবলুসের জনহীন পথে মাঝরাতে ; কোনো নির্জন অলিভ গাছের অন্ধকারে সেইসব নির্বাসিত ছায়ারা ঘুরে বেড়ায় উদ্দেশ্যহীন ; সদ্য কুঁড়িফোটা সায়ট্রাসের বাগানে এসে কেউ থমকে দাঁড়িয়ে মাটি নেয় মুঠোভর্তি , তারপর গায়ে-মুখে মাখে উন্মাদের মত কিছু খোঁজে ; নতুন অলিভ ফল হাতে ছুঁয়ে আবার যে যেপথে এসেছে সেইপথে মিলিয়ে যায় , হারিয়ে যায় , তাদের কথা কেউ জানেনা , খোঁজও কেউ নেয়না। তবে কেউ কেউ ওই নির্বাসিত ছায়াদের দেখতে পায় বটে। সেইরাত্তিরে বার্ঘুতি প্যালেস্টাইনের সব নির্বাসিত ছায়াদের সাথে হাঁটছিল , মাখমুদ স্ট্রিট খুঁজতে। সে আর কাউকে ঠিকানা জিজ্ঞাসা করেনা , রাস্তার নাম জানতে চায়না ; মাখমুদ স্ট্রিট দূর গাজা জাবালিয়ায় হতে পারে বা রামাল্লাহায় - সেটা আর গুরুত্বপূর্ণ নয় , খোঁজটাই কেমন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় ; হাঁটতে হাঁটতে ভোর রাতে নাবলুসের কাছাকাছি কোনো অলিভ খামারের ধারে জিরিয়ে নেয় , ঝিমোয় ক্লান্তিতে ; অতল ঘুমের ভেতর থেকে সাইপ্রাস হয়ে ঘুরে আসা ভূমধ্যসাগরের ঢেউ গাজার সমুদ্র সৈকতে যেরম উচ্ছলতায় আছড়ে পরে তার শব্দ পায় ; পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর শঙ্খচিল জাবালিয়ার তটে উড়ে বেড়ায় ; বার্ঘুতির শৈশবের দিনের কথা মনে আসবে , তাদের সাইট্রাস বাগানে আরেকটা বোমা পরলে পোড়া সায়ট্রাসের পাতা চর্-চর্ করে ফাটবে গভীর বেদনায় ; নিজেকে মিথ্যে সান্তনা দেবে আবার , মাখমুদ স্ট্রীটের সেই ঠিকানা ভুলে যাওয়ার ভান করবে , সেই বাড়িটা , গত তেত্রিশ বছর , তার আগের একুশ বছর নির্বাসিত ছায়াদের মত যে বাড়িটা খুঁজছে , সেটা রামাল্লাহায় হতে পারে কিংবা জেরিকোতে , নাবলুসে হতে পারে ; তেলাভিভ অথবা জাফ্ফায় হতে পারে ; জাবালিয়ার তটে সাইট্রাসগাছ ছাওয়া সেই বাড়িটা যার তলায় মৃত প্যালেস্তিনীয়দের গণকবর লুকোনো আছে আর আছে কান্না , জেলবন্দী নাঈল বার্ঘুতি সেটা ভুলে যেতে চাইবে প্রবলভাবে !
"I am Adam of the two Edens, I who lost paradise twice.
So expel me slowly,
and kill me slowly,
under my olive tree"
- প্যালেস্টাইনের সবকটা নাঈল বার্ঘুতি'কে আর তার নির্বাসিত প্রত্যেক দেশবাসীকে
সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৬
মায়াকভস্কি তোমাকে
৪:৩০:০০ AM / by কমলেশ /
No comments /
মরে যাওয়া নদীটার ধারে পশ্চিম দিকের আকাশে তাকিয়ে বুড়ো খিরকীন লোরচা ভেবেছিল এবার থেকে ভালো মানুষ হয়ে যাবে। উছল গাঙ্গে আশ্বিন মাসে কেমন বেমানান চরা দেখে তার নিজের মাথার চুল মনে হয় , কেমন পুরনো শুকনো , দুই কোমর-তিন কোমর বালি খুঁড়লেও জল পাওয়া যাবেনা যেন।
বুড়ো খিরকিনের ঝিমোনো রোগ যেবার হলো , তারপরের বচ্ছর তাকে পেল আরেক রোগে। পরামানিকের চরা উত্তরে আরো চারমাইল লম্বা হল সেই শুখার সনে , দূর দূর গায়ের আরো কিছু লোক পাকাপাকি থান বসালো যার যার ; মহাল দাগালো থলকলমির বেড়া দিয়ে ; কোন আভাগা চাষা একদিন ভুলেই টাকা চেয়ে বসল ধারে তার কাছে ; বুড়ো খিরকিন মানুষের এমন রূপ তো দেখে নাই আর কখনো , বাপ্ রে বাপ ! কি তার চোখের জেল্লা , মনে হয় এক্ষুনি ফেটে বেরিয়ে আসবে খুলির ভেতর থেকে ! ধারের টাকা পাওয়া সেই চাষার খুশির চেয়ে , লোরচার ঢের বেশি আকর্ষণ ছিল ও ব্যাটার লোভাতুর চোখ দুটোয় ; তারই মতন শীর্ণ , নিষ্প্রভ আর মৃতপ্রায় আরেকটা মানুষ কেমন খোলস খুলে খুলে ধারের গল্প ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে বলতে কলিজার ভেতরের গোটা আরেকটা শয়তানের ফন্দিভরা মানুষকে আলতো করে এনে দাড় করালো খিরকিনের উঠোনে তারই সামনে আরেকটা নতুন গল্প শোনাতে ; সে মানুষ যেমন চতুর তেমন মিচকা সয়তানের মতন নিরাকার , তাকে যেদিকে ঘোরাও সেদিক ঘুরবে , যা মানাতে চাও তাই মেনে নেবে , তোমার কিসে কিসে আপত্তি হতে পারে সেইসব আগাম আন্দাজ করে সেইমতন তোমার হাতের ওপর গড়াগড়ি খাবে , তখন তুমি তাকে কাতুকুতু দিতে পার , টোকা দিয়ে অস্বস্তিতে ভরাতে পার হামেশাই , থেঁতলে দুই হাতের তালুর মধ্যে দমবন্ধ করে মারতে পার অবধি অথবা কান মলে দিয়ে আকাশের দিকে হাঁ-করে তাকিয়ে থাকতে বলতে পার , দূর দূর অবধি ছায়া খুঁজতে বলতে পার দীর্ঘ ছত্রিশ বছর যেমন খিরকিন নিজে খুঁজেছে হারিয়ে যাওয়া লাশিনের ছায়া , নিজের মৃত স্বজনদের ছায়া দীর্ঘ ক্লান্তিকর শতক ধরে , সে তাই করবে মুখ বুজে ; একটাও শব্দ করবেনা অভিযোগের !
সেই থেকে মল্লারপুরে রটে গেল খিরকিনের কথা , ধার দেয়ার লোক বুড়ো খিরকিন লাশিনের ছায়া খোঁজা ছেড়ে ,নদীর ধার ছেড়ে ধার-খোঁজা মানুষের ভেতর আরেক যে শয়তানের দেহ বসত করে , সুন্দর - সহজাত সয়তানের দেহ , তাদের গল্প শোনে সে এখন , পেয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতন করে লোক ছাড়ায় , ভেতরের ধান্দাবাজ সহজাত মিচকা শয়তানের ডেরা সেইটার সন্ধান করে বেড়ায় ।
কয় বিঘা জমিজমা আর কয়েকভরি যৌতূকি মাকরির মালিক খিরকিনের আসল কয়েকমাসেই ফুরিয়ে গেল। আরো
বছরখান কাটল তার সেই পুরান ছায়া খুঁজে ; জৈষ্ঠ্য মাসে ভাটিপ্রহরে গরম জলের ওপর হাসফাস করা রঙিলি বরোলির ঝাঁক ঢেমড়ে সাঁতার কেটে বেড়ালে, নিজেকে সেরকম উদ্দ্যেশ্যহীন মনে হয় তখন তার , মনে হয় সে কখনো লাশিনের ছায়া সত্যি খোঁজেনি পশ্চিম দিকের আকাশে তাকিয়ে , খুঁজেছে অন্য কিছু !
মল্লারপুর , পরামানিকের চরায় সন্ধ্যেবেলা ধানভাঙ্গা কলের আওয়াজ পাওয়া যায় ; ঢেঁকির মিস্তিরিরা মহাল ছেড়েছে কবে কেউ জানেনা , ঐদিকে ট্রানজিস্টরের শব্দ , অধুনা আমদানি সাইকেলের বিচ্ছিন্ন সান্ধ্য বেলবাজি কাঁচা সড়কটাকে মাতোয়ারা করে রেখেছে ; সেরকম এক সন্ধ্যেয় সর্বস্বান্ত খিরকিন লোরচা পরামানিকের চর ছাড়ল , ওই মেখলিগঞ্জের কালো আকাশটার উল্টোদিকে , পশ্চিমে , যেদিক থেকে লাশিনের ঘরে ফেরার কথা ছিল , সেই পশ্চিমের আকাশের তলায় বসতির টিমটিমে আলো নিশানা করে হাঁটা লাগলো মন্দলঘাট রেলগুমটির দিকে ! দিনের শেষ ট্রেনটা কালো ধোয়া উড়িয়ে ছুটে যাবে শহরের দিকে কিংবা অন্য কোথাও। হালকা বিজলীর আলোয় দিব্যি বোঝা যাবে একেকটা মানুষের অনেক অনেক ছায়া , প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতম গভীরতায় বৃহৎ আরো বৃহত্তর ছায়া কেমন হারিয়ে যায় , কেমন একটা আরেকটাকে গভীর স্নেহে গ্রাস করে , খাদকের অপরিসীম সৃজনশীলতায় অধুনা নাগরিকের দল কেমন মেতে ওঠে পশ্চিমগামী রেলগাড়িতে । যদিও ইস্পাতের দুটো লাইন রেলপথের কোথায় মিলেছে কেউ জানেনা ; আপাত মিলন যে সামনেই কোথাও , তা যে-কেউ দেখে বলে দিতে পারে কিন্তু ওই রেলগাড়ি যতোই এগোয় , লাইনদ্বয়ের সন্ধি তত এগিয়ে চলে আর ছায়ারা ছুটে চলে দিবারাত্র , সীমাহীন আগ্রাসী যাত্রায় ! খিরকিন লোরচা তাদের সাথেই যোগ দেবে !
বুধবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৬
আড়ল সাগর তীরে
১:৩০:০০ PM / by কমলেশ / in Aral Sea, Aral Sea Shipwrecks, Barsa-Kelmes, Beşbarmaq, Bukhara, Kazakh, Louder Than Words by Pink Floyd, On the banks of Aral Sea, Shashlik, Stories of Aral Sea, Stories of Kazakhstan /
No comments /
১.
সারাদিন মাছধরা নৌকার ঝাঁক দুরে যেতে যেতে ছায়া হয়ে গেলে শুনশান লাগে। একপাড়া ঝাঁ-ঝাঁ রোদে কোত্থেকে একটা উদলা গায়ে ছেলে টই-টই করে এদিক ওদিক ছোটে ; শুটকির গন্ধে ঘন বাতাস , তখন মনে হয় বাবলা মাছের গন্ধ কথা বলে , জলের ভেতরে আমাদের সমুদ্দুরের পেটের রঙের গল্প বলে , অচিন মাছের কসরৎ করে সাঁতরানো দেখাতে চায় , হাঃ হাঃ ! ছেলেটা পাগল , শীস দিতে দিতে ওই যে অন্তিলোপ আর রোমশ করসাক শেয়ালের জঙ্গল বারসা কেলমেজের দ্বীপ জুড়ে ওখানে হারায় ; তারপর আর নাগাল পাওয়া যায়না । আভনের জঙ্গলে হারানো বাছুরের খোঁজে যারা যায় তাদের কেউ একটা হাঁক দেয়না তাকে আর সন্ধ্যেবেলা। তারপর হিম নামে , সমার্খান্দী মেঘ ওম নিতে খিরকীন লোরচার ঘরের অনেক পেছনে দান্দিহুল্লা উপত্যকায় ঘাপটি মেরে থাকে চুপচাপ ; তখন ও-ছেলের গায়ের ওপর জোনাকি খেলে , তা-দেয় , মৌরুশি পোকার দল গান গায়। জেলের দল তখনও ফেরেনা। কেউ একটা আলো দিয়ে যায় ঘরে । শুটকির বাস্ নিভে গিয়ে হরতনলতার বিষাদের কান্না নাকে আঁচ পাওয়া যায় , খুসবুদার , সুর্মাইয়ের মতন অন্ধকার আড়ল সাগরের তীর ধরে। লাশিনের আম্মিজানের একটাই পুরান খত্ খোলা যায় হামেশাই ।
* * * * * * *
তারও অনেক বছর পর মাখমুদের যখন সবে গোঁফের রেখা স্পষ্ট হওয়া শুরু হয়েছে , তার বৃদ্ধ দাদুকে নিয়ে অরাল্স্ক শহরে পাড়ি দিল সে শতাব্দীর হারিয়ে যাওয়া মাঝিদের সন্ধানে । তিনদিনের দিন তারা নুকুস শহর ছাড়ল । এরপর এলো শুষ্ক মরুদেশ । ইউরাশিয়ান নমাডিকদের কেউ এর আগে এই মরুদেশের গল্প বলেনি । জাহান্নমের অভিশাপ নিয়ে আড়াল দরিয়ায় কবে এই শুকান চরা জন্মালো খোদা জানে। দূর দূর যতখানি দেখা যায় লোনা বালু আর নাঙ্গা মরা দেশ - রুক্ষ। রোদ যত বাড়ে মাটি ফাটার শব্দ হয় চড়চড় করে , পূবে তিয়েনশান পাহাড়ে যে বুনো আপেল হয় , সেই আপেল কামড়ানোর শব্দের মতন মাটি ফাটার আওয়াজ । আড়ল দরিয়ার জৌলুস আর নাই ! যত মরুদেশ পার হয় মাখমুদ আর বৃদ্ধের বাড়তে থাকে বিস্ময় আর অরাল্স্ক পৌঁছনোর অনিশ্চয়তা । সপ্তম দিনে এক বুনো উটের দঙ্গল দেখা গেল উত্তর আকাশের সীমানায় , তাদের পায়ের ছাপ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আরো দূর পৌঁছলে অভিযাত্রিদ্বয়ের অনিশ্চয়তা ভয়ের রূপ নিল। এরপর যা দেখল গোটা দুনিয়ায় কেউ সেরমটি দেখেনি ! হায় রে হায় ! মাইলের পর মাইল শুখা মরুদেশে জাহাজের খোল পরে আছে , হেলে ভেঙ্গে বালুর ভেতরে ঢুকে , কোনোটা আধডোবা কোনোটা বালুর মধ্যে খাড়া হয়ে মরে পরে আছে এরম হাজার হাজার মাছধরা খোলানৌকা , বাহারি দশটনি শিকারী জাহাজ , পাশে লকপক করছে তার নোঙ্গর বলিতেই ; আর হওয়ার শনশন আওয়াজ হিম ধরিয়ে দেয় ! উটের পাল অনেক আগেই কোথায় পালিয়ে গেছে মাটির ছাপ রেখে , কোনো পাখি নেই , এন্তার ইউরাসিয়ান কাঠবেড়ালের পাত্তা দূর থাক ! তারপর রাত্রি নামলে সেই জাহাজের কবরখানায় ওপর জান্নাতের তারাভরা আকাশ আর বাতাসের হাহাকার শুধু । তামাম দুনিয়ায় এত শুনশান মহাল আরেকটা হবেনা বাজি রাখা যায় আলবাত্ । সমার্খান্দ , বুখারা , তামাম আফগানি রেগিস্তান এরচেয়ে বহুত আরামের । মাখমুদের ছোট্টবেলার কথা মনে পরে , যেইদিন আম্মিজানের মুখে অরাল্স্কের পানশালা আর মাছের আঁশটে গন্ধভরা বন্দরের গল্প শুনেছিল , সেখানকার বাহারি দাস্তারখান সাজানো খাবারের দোকানে যখন সন্ধের আলোয় গরম বেশবার্মাক আর সাশলিক কাবাবের ভুরভুর করা ঘ্রাণে অরাল্স্কের আকাশ ভরে যেত সেই আকাশ বড় অচেনা লাগে এখন । তার বুড়ো দাদু জবান হারানো ; কবেকার তামাটে হওয়া প্রাচীন কোনো যেন তাম্রপ্রস্তর যুগের নারী তার দাদী কাজাখ ভাষায় যে চিঠি লিখেছে , আড়ল মরুদেশে জাহাজের কবরে বসে ; ক্ষয়িষ্ণু কাঠের আগুনে যতটুকু আলো হয় , তার ঢিমে হয়ে আসা ঘোলা চোখে সেই চিঠি পড়ার চেষ্টা করছে বুড়ো ।
০৭/০১/১৬
রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৫
পিরীচপুর ১
১০:১৬:০০ AM / by কমলেশ /
No comments /
পিঞ্জিরীগঞ্জ ফিরৎ সদাগরী নাও ,
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫
হাসানের গল্প
৫:২০:০০ PM / by কমলেশ /
1 comment /
পেঁপে আবিষ্কার ও লংকা-কাণ্ড ।
শিরোনাম এটাই হওয়া উচিত ফরিদুল হাসানের কথা বলতে চাইলে ।
গ্রীষ্মের ছুটি পড়ে গেল । মাইনর স্কুলের ছুটি মানেই একমাসের কমে থামার নামধান্দা থাকেনা । বাচ্চা পোলাপান কম ছুটিতে পড়বে কেমন করে আর দুটো আম-লিচু খাওয়া , পাড়ায় পাড়ায় দৌরাত্ম্য করে না বেড়ালে স্কুলের ক্লাস কাটিয়ে সেসব করবে যে ! তাই ঢের ছুটি অবাস্তব হতেই পারেনা , বরং বুদ্ধিমানের মস্তিষ্কপ্রসূত একটি উত্তম বন্দোবস্ত এটি। মোদ্দায় এই হল জাস্টিফিকেশন আমাদের কাছে । জ্যৈষ্ঠমাসের গরম যত বাড়বে , লিচুর ঝাড়ে ততবেশি রঙের খেলা , সবুজ লিচুর গায়ে খানিক রঙ দেখা দেবে প্রথমে , তারপর পাকতে পাকতে লিচু যত লজ্জা পাবে তত রঙ গাঢ় হবে , টইটুম্বুর লিচু রসালো অন্তরভাগ নিয়ে গরম সইবে ; দোল খাবে বিকেলের ঠাণ্ডা হাওয়ায়। ঠাকুরদাদা বয়স্ক ব্যাক্তি , সবুর করার ধাত একটু বেশিই ; ফলত দিনের বেলা লিচু পাহারা ও রাত্তিরে পুরান মশারি ঢেকে , পাড়া-পড়শির গভীর রাতের ঘুম ভণ্ড করে টিন বাজিয়ে বকদুল , রাতচোরা ইত্যাদি লিচুর ধান্দায় ঢুঁ-মারা পক্ষীকূল ভাগিয়ে তার ওই টইটুম্বুর অন্তিমভাগের পরিণত লিচু চাই-ই চাই । দিনটা শুক্কুরবার ; সকালের জলখাবারের পর থেকে বহু চেষ্টায় মৃদুপক্ক লিচুলাভের সকল প্রচেষ্টা বিফলে গেল ; ষষ্ঠীদাদা , তিকেন আর পম্পিদিদির সাথে গম্ভীর ‘গোলটেবিল বৈঠকে’ ঠিক হল ঠাকুরদাদার গোসলের সময়টা টার্গেট করা বিচক্ষণের কাজ বটে ! দক্ষিণঘরের বেরার ফুটোতে ওৎ পেতে বসে আছি তার গোসল-যাত্রার অপেক্ষায় , এমন সময় গোটা বাড়ি শোরগোল ফেলে কে যেন হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, কিছু বোঝার আগে চেয়ে দেখি একজন ঠাকুরদাদার গলা ধরে কাঁদছে, খানিক বাদে তারও কান্না শুরু । ঠাকুরদাদাকে আমরা কেউ কাঁদতে দেখিনি , সাথের লোকটিও অচেনা । সম্বিৎ ফেরার আগেই লক্ষ্য করলাম সাথে আরেকটি মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি ও আমাদের বয়সী ছেলে । প্রায় আধঘণ্টা সময়পর ক্রন্দন-পর্ব সমাধা হলে দেখা গেল বাড়ি ভেঙ্গে সব লোক জড় হয়েছে । চোখের জল মুছে ঠাকুরদাদা বীরদর্পে আয়োজনের ফরমায়েশ নিয়ে ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে উঠল ; প্রকাশ মাছ ধরতে গেল , বাড়ির গৃহিণীরা ভালমন্দ রান্নার বন্দবস্তে ব্যাস্ত হল। খানিক বাদে বোঝা গেল কানাঘুষোতে , সেই লোকটি হাসানচাচা ! জন্মের পর থেকে আমাদের একান্নবর্তী কালেক্টিভে প্রত্যেক সন্ধ্যেয় একছিল সুর করে পড়া ধারাপাত আর এই হাসানচাচার গল্প , যতক্ষণ না আটটার ট্রেন দশক্রোশ দূরে কাশিয়াবারিতে হুইসেল বাজায় ! সাতচল্লিশের আগে আমাদের বাড়িটাই ছিল হাসানচাচার বাড়ি । দেশছাড়ার সময় আমাদের নীলফামারীর ঘরের মালিক হল এই হাসানচা । তার মামাবাড়ির দ্যাশ হল ওই মেখরটারি ; কমবয়সে ঠাকুরদার সাথে তার বাইচের দলে মোলাকাত , সেই থেকে দোস্তি ! সেই হাসানচাচার ছেলে হল ফরিদুল হাসান । জমির মোকদ্দমায় ভিটেমাটি যাওয়ার জোগাড় , হাসানচা’র এইমুলুকে আগমন মামলার ক্যাপিটালের ধান্দায় । ছোট হাসানের সাথে দোস্তি সেই বিকেলেই ; তার ডাংগুলি খেলার নিপুণতায় হুব্বা সবাই , এক দানে বিশফুট দূরে নড়ি ছুড়তে পারে আর লাট্টু ফেঁকার কায়দা তো লা-জাবাব ! পরদিন দুপুরে খামিরের দিঘিতে সে ডুবসাঁতরে দুই মাথা জলে শোল ধরল ; সেই থেকে ফরিদুলের যাবতীয় কর্মকাণ্ডে ওস্তাদি কবুল করল মহল্লায় বাচ্চা-কাচ্চা। হাসানচাচার অর্থসন্ধান কর্মকাণ্ড বেশ দীর্ঘ হতে লাগল , সাথে ফরিদুলের সাথে দোস্তিও । বড় হাসান আমাদের সম্পর্কে চাচা নাহলেও , বাপ-জেঠার গল্প শুনে আমরাও কেমন হাসানচা বলা আরম্ভ করেছি । ফরিদুল তার তৃতীয় সংসারের পোলা । বাকি দুইটি মা তার গত হয়েছে ঢের আগে । একদিন সকালে ছোট হাসান ঠাকুরদাদাকে ধরলে বাশবাগানের ওই লাউমত ফলের ঠিকানায় । ও ফল যে বাংলাদেশের নয় সে নিয়ে নিশ্চিত ; গোটা রংপুর , নীলফামারী , ডোমারে এই ফল তো কেউ দেখে নাই ! জানা গেল ও ফল ফিরিঙ্গীর দান । হলদিবাড়ির যে র্যা লে সাহেবের রেলগুমটী পাটের গুদামের , সেইখানে হরদম এই পেঁপেগাছের জঙ্গল । সাহেবসুবো গর্মির দিনে তার পাকা ফলে নুন মাখিয়ে ফলার করে , অধুনা যা মেলার মাঠ সেইখানে , এলাকার সবকটা তামাকের কোম্পানি , পাটের কোম্পানির ফিরিঙ্গী এক হয়ে আড্ডা দেয় সেই ফল খেতে খেতে ; গুলঞ্চের ছায়ায় সফেদ কাপড়ে ঢাকা টেবিলে সাজিয়ে রাখে , গল্প করে । সে যে বিষফল নয় , তার প্রমানে শুরু হল পেঁপে দিয়ে অতিথিসেবা ওই মধ্যাহ্নেই ঠাকুরদাদার তলবে ! দুপুরে পেঁপে সর্ষে , পেঁপে পাঠা , পেঁপে টক; রাত্তিরে পেঁপের ডাল , কাঁঠালের বীজের সাথে পেঁপে ঘণ্ট , পেঁপে পুঁটি প্রভৃতি ! স্বাভাবিকভাবেই পরদিন তাদের শুরু হল পেটগর্মি ! দুই হাসানের আর একটুও সন্দেহ রইলনা যে সেই ফল বিষফল অতি অবশ্যই ! ইতিমধ্যে হাসানচাচা কিছু অর্থসন্ধানে সমর্থ হলেন ; তার ঘর ফেরার দিন এলো কিন্তু হাসান ফেরা হলনা । দেশে বিবাদের শেষ নাই , আত্মিয়-কুটুম্ব , ভাই-ভাইজানে লড়াই বড় । ফরিদুল রইল নুরুলের-টারিতে চাচার কোন ফুপাতো বোনের বাড়ি । মহাল শান্ত হলে ফের ফরিদুল ফিরবে তার মুলুকে । সেই শুরু আমাদের আহ্লাদের দিনরাত্রি । হাসান ভর্তি হল আমাদের মাইনর স্কুলে । ঘুঘুমারির দহলায় সে যায় কম , ঘুরি ওড়াতে । মহল্লায় শিরীষ গাছের সারি ধরে , পুঁই গাছের মাচার পাশ দিয়ে তার ঘুরি ওড়ানোর ধান্দা বেশি । সে বলে অত উঁচুতে উড়িয়ে মজা নেই । যত কম খাঁড়া , গাছগাছালির মাঝে ঘুড়ি ওড়ানোয় বেশি মাথা লাগে , মজাও ! তার মতন জঙ্গল ঝাড়ের মাঝে ঘুড়ি ওড়ানো এপাড়ায় কারো সাধ্যি নেই । বর্ষালী দিনে হাসান এসে ভামবিড়ালের ডাক দেয় মাঝরাতে , পা টিপে টিপে পেছনবাড়ির দোর খুলে ডেকে নিয়ে যায় মাছ ধরতে , হাতে টাঙ্গি আর পুরান রিক্সার টায়ার , কখনও মন্ডলঘাট – সিপাইপাড়া তো কখনও ভোলারহাট আরও দূর । ভোর হওয়ার আগেই ঘরে ফেরা । মাঝরাতে দূর অবধি আকাশ নেমে যাওয়া দহলায় নিজেদের প্রেত মনে হত ! মাঝে মাঝে টায়ারের মশালে পোড়া গন্ধ অসহ্য হয়ে এলে নিভিয়ে দিই ; কালিডাঙ্গায় দূরে কালো মেঘ জমে এলে ভয় করে তখন , লোম খাঁড়া হয় দহলার শিরশিরে বাতাসে , বাড়ি ফেরার ইচ্ছে হয় খুব । হাসানের এত কিছুর টাইম নাই , তার মাথায় যেন কীসব ভর করত , মাছধরার ঘোরে পাগল হাসান তখন কথা বলত না ! ওইমতন এক রাত্তিরে কুম্বারির রেলপুল পার হয়ে কোথাও পৌঁছে গেছি , কারো কোন হুশ নেই, রাত দুটো পার হয়েছে হয়ত ! খোলোই পুরো ফাঁকা ; মাছ মিলছেই না আজ , হাসানের মেজাজ গরম । অমাবস্যা কিনা জানা নেই তবে কৃষ্ণপক্ষ চলছে সেটা নিশ্চিত । আরও দহলা পার হই আমরা , কাশিয়াবাড়ির ডাঙ্গা আসে তারপর পাঙ্গার সোঁতা ; দূরে গাঁয়ে কুকুর কেমন সুর করে কাঁদে , পায়ের তলায় ঠাণ্ডা কিছুর ছোঁয়া লাগতেই বুকভেঙ্গে চমকে উঠি ; ভয়ার্ত হাসান চমকে উঠে আশ্বাস দেয় ও ব্যাটা জলঢোঁড়া ছাড়া কিছু নয় , সে গুণগুণ করে গান গাওয়ার চেষ্টা করে । ডাঙ্গায় হোগলার বন মান্দার গাছের ঝোপ পেরোতেই পাঙ্গার নাগাল মেলে । টাঙ্গি নিয়ে খোঁজাখুঁজি চলে আবার , টপাটপ বোয়াল মিলছে , কাছেই কোথাও শ্মশান নিশ্চয়ই , নাহলে বোয়ালের এত দাগি চেহারা কে কবে দেখেছে , হাসান বলে ওঠে । তার কথা শেষ হওয়ার আগেই পেটে গুঁতো দিল হাসান , ইশারায় দূরে তাকাতে বলল , চেয়ে দেখি চার-পাঁচটা আগুনের গোলা প্রায় চার সাড়ে চারশ মিটার দূরে নদীর এপার থেকে ধীরে নদীর ওপারে যায় , মাটির খানিক ওপরে সবকটা গোলা , তখন ভয় নেই , কি ছিল কিছু বোঝার মতন অবকাশ ও নেই , শরীর অবশ লাগে , মাথা ঝিমঝিম করে গলা শুকিয়ে আসে আর নিজের অজান্তে খাঁড়া হওয়া লোম ; পা কাঁপছে । হাসান আবার গুঁতো দেয় , আমার হাত থেকে মশাল নিয়ে এগোতে থাকে কিছু না বলে , আমি অদ্ভুত ইশারায় তার পিছু ছলা শুরু করি , মাছের খোলোই কোথায় ফেলেছি মনে পরেনা । হাসান এগোতেই থাকে আগুনের গোলার দিকে । গায়ে বিদ্যুৎ খেলে যাওয়া ব্যাপারটা কেরম হয় সেই প্রথমবার বোঝা , শিরদাঁড়ায় শীতল কিছু বইছে কেমন । হাসানের পিছু পিছু এগোতে থাকি । কতখন হেঁটেছি মনে নেই ; আমার মুখ দিয়ে একটাই কথা তখন , চল হাসান ঘর যাই , আর মাছ ধরে কাম নাই । হাসান একসময় বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয় ; মাছের ধান্দায় আমি নাই , এইরকম ভুতের খবর আমি অনেকদিন শুনছি , আজ না দেইখ্যা শান্তি নাই । মেলা দিনের খোয়াব এইডা ! আমার মুখে তখনও সেই এক কথা , চল হাসান ঘর যাই । আগুনের গোলার আরও কাছে আসতে হঠাৎ আন্দাজ হল কেউ মাথায় হাঁড়িতে আগুন নিয়ে হাঁটছে , আরও খেয়াল করতে বোঝা গেল , লম্বা চূল , রোগা চেহারার মেয়েমানুষ ; হোগলার বনে লুকিয়ে গোলার আলোয় আরেকটা জিনিস দেখে এইবার পালানোর কথা মনে এলো । কারো যে মুখ দেখা যায়না ! মুখগুলো বিকৃত কারো কান নেই কারো চোখ কেউ যেন গুঁতো মেরে নষ্ট করেছে , কারো নাক গলে ঝুলে পরছে মুখের ওপর , গলায় ঘা , মুখে পিঠে ঘা ! সেই দেখে হাসান মারল দৌড় ,আমিও ঝাপ জলে । ওদিকে আগুনের গোলা বাহকদল তেড়ে গালি দেয়া শুরু করেছে । পাঙ্গা পেড়িয়ে দৌড় আরও । এরম কতক্ষণ দৌড়েছি মনে নেই । একটা গ্রাম আসতেই কুকুরগুলো আরও জোরে চেঁচানো শুরু করল । কে যেন হঠাৎ হাত ধরে মাটিতে শুইয়ে মাথায় জল দেয়া শুরু করেছে , কেউ কুপি নিয়ে মুখ দেখে বলছে বুড়ারবাড়ির পোলা না , পিলকের টারির ছেমড়া যে , এত রাতে কি করে !! হাসানের পাত্তা নেই ! ভোরে তারা বাড়ি পৌঁছে দিল । বাড়ির লোক দেখে অবাক । ঘরের ছেলে কুম্বারি কেমনে গেল ! আমাদের মাছ ধরার গল্প আর কেউ জানেনা । বাড়ির মানুষ ভাবলে ভুতে পেয়েছে , নিশি ডেকে নিয়েছে ছেলেকে । তুকতাক মন্ত্র পড়া চলল সকাল অবধি । কেউ মধু ওঝাকে ডাক দিল , হাবাং হোমিওর ডাক্তার সেই এক ওষুধ খাওয়ালো , জ্বরে যা দেয় কিংবা পেটব্যাথায় । জেঠি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে , এযাত্রায় বাঁচন গেল তোর , রাইতে একেলাই থাকার কাম নাই ! হাসান পরদিন দেখা করল ক্লাসের হাফটাইমে । মুখ ব্যাজার করে বলল এইবারও ভুত দেখা হলনা ! কাসিয়াবারির পাঙ্গার ধারে সেই হোগলার বনে নাকি এলাকার কুষ্ঠরোগীর বাস । তারাই অমাবস্যার দিন কিসের যেন উপাসনা করে মাথায় আগুন নিয়ে উলঙ্গ হয়ে নদী পারাপার করে । হাসান মুখ ভার করে সে গল্প শোনাল । তারপর আর অনেকদিন যাওয়া হয়নি মাছধরতে ।
ভাদ্রমাস পড়ে গেল । হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষার সময় । হাসান গোটা স্কুল অবাক করে আরেকটি ওস্তাদি করল । কর্মশিক্ষার ভাইভা সেদিন । কেউ কলমদানি , কেউ পাটের দড়ি , কেউবা মাটির আম , আতা বানিয়ে হাজির । মালিপাড়ার ছেলেদের কাজ বেশি মাটির । শুধু হাসানের হাতে কিছু নেই । কেউ জিজ্ঞেস করলে সে মুচকি হাসে । সহপাঠীরা যে যার মত নিজের নিজের ভারসান বানানো শুরু করেছে ; কেউ বলে হাসান এবার ডাহা ফেল , কেউ বলে হাসান তো ওস্তাদ , কিছু একটা ব্যাপার ঘটাবেই । ভাইভার টিচার নরেন্দ্রবাবু ; সারাবছর তার আমাশার ব্যামো , চরম উত্তেজনাহীন কিছু হলে সেটা নরেন স্যার , নজরুলের কবিতা আর সহায়কে দুর্গার মৃত্যু একরকম নিঃস্পৃহতায় পড়ান । সবাই বলে নেতিয়ে নরেন ! সেই নরেনবাবুর সামনে হাসান ইতিহাস বইয়ে বুকচিতিয়ে লর্ড কার্জনের ছবির মতন দাঁড়িয়ে পকেট থেকে দুটি গোল বস্তু টেবিলের ওপর রাখল । কেউ কিছু বোঝার আগেই দারিমি চিৎকার করে বলল ‘এ যে পেটো !’ । নেতিয়ে নরেন তার জীবনের যাবতীয় জমিয়ে রাখা উত্তেজনা দিয়ে আমাশার কথা ভুলে হাসানকে তাড়া করল । হাসান একছুটে চোখ বড় বড় করে পাঁচিল টপকে সেই যে গেল তো গেলই !
(চলবে)
খিরকিন লোড়চা
৫:১০:০০ PM / by কমলেশ /
No comments /
এখানে ভরা সময়ের গান নেই আর
মত্ত মানুষের দল হিজিবিজি খেলে কাটাকুটি খেলে ,
দারুন প্রগলভ কোন দিনে
তোমার তোমার মতন উচ্ছাসে , হুল্লোড়ে
খাদকের নমনীয় মাংসপিণ্ডে প্রেমহীন সময়ে
দয়াপরবশহীন রাষ্ট্রযন্ত্র অঙ্গদর্শন-ভনিতায়
তোমার চোখের ওপর তাকিয়ে ভয় পাবে
এখানে শূন্য শতকের রাত্রিদিন
আবার মহল্লায় মহল্লায় ছেড়ে ছেড়ে যাওয়া
ভেঙ্গে ভেঙ্গে যাওয়া ক্ষত বিক্ষত আস্বাশ পৃথিবীর বিনীত নরম বালির ওপর একসাথে হাঁটবে -
কাঁদবে প্রবল শ্লাঘাহীনতায় ;
খিরকিন লোড়চা - কবেকার খিরকিন লোড়চা'রা
ইতিহাস তোমাদের মনে রেখে যাবে ।
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫
বিস্যুতবারের গঞ্জ
১২:৫৩:০০ PM / by কমলেশ /
No comments /
স্বপ্নময় কোনও রাতদুপুরে শিথান জুড়ে আনাগোনা ভুলে গেছে পদ্যেরা
ঘুম নেমে আসে – ঘুম - চাঁদপাড়া ভেজা বাওরের দেশে ঘুম নামে
বিচ্ছেদের মত নিস্তব্ধ -
হীনতা -
নীলকণ্ঠ পাখি এক – মৃত
কাফনের সফেদ মায়া ;
তোমায় শুধু ছুঁতে চেয়েছি ।
গৌড়ের চেয়েও প্রবীণতর তরাইয়ে প্রথম মুথোঘাসের জন্মলগ্ন
আরও আদিকাল ধরে হেলেঞ্চার বনে ওম - অনন্ত রাত্তির
যুবতির নিদ্রাহীন চোখ কালিসিটে,
তার গাঢ় নিঃশ্বাসের ভাপ জমে সারাগ্রাম হেলেঞ্চার বনে ;
সমস্ত শহর ছারখার ঘরমুখো পলাত্বকা জনতা আমার বিস্যুতবারের গঞ্জ
বারসইয়ের দীর্ঘতম বাঁক ঘুমের ঘোরে কতক্ষণ বহুক্ষণ পেছন পেছন
বেহেশতের শ্রাবণ মাসে আমন ধানের গন্ধভরা অতিবিস্মৃত গাঁয়ে
বয়স্ক প্রেমিকের তোরঙ খোলার মত
গভীর আবেশে জানালায় উঁকি অহরহ,
মহাকাব্য-প্রাচীন একটা শিশু হামাগুড়ি দেয় আলপথে
থমথমে মুখ দীর্ঘ খ্রিষ্টপূর্ব –
অবার্চীন মাঝরাতে মশাল জ্বালিয়ে সমস্ত দিনাজপুর দহলায় রূপচাঁদা খোঁজে ;
মছলন্দপুর ঘাটে নৌকার খোলে মাছের ঘ্রাণ ভরে – স্যাঁতস্যাঁতে – গাঢ় ,
শেষরাতের স্টিমার শহর পাড়ি দেবে তারপর ,
জমে যাওয়া মৃত উজ্জ্বল চোখ, মৃত মাছের নশ্বরতা বেচে
গত শতাব্দী তার আগের শতাব্দী আরও কোন পুরাতন দিনে
চৈত্রের শিমুলতুলো উড়িয়েছি শুধু – ফ্যাকাশে কথাভাষাহীন ।
শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০১৫
যা কিছু বলা যায়
৩:১২:০০ AM / by কমলেশ /
No comments /
লোহাগড় , কাড়লা, ০৪/০৭/১৫











